বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতিতে এ সিদ্ধান্তের সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট গত সপ্তাহে এক ঐতিহাসিক রায়ে জানিয়েছে, ১৯৭৭ সালের ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট’ ব্যবহার করে বিশ্বের প্রায় সব দেশ থেকে আমদানীকৃত পণ্যের ওপর প্রেসিডেন্ট এককভাবে কর আরোপ করতে পারবেন না। আদালতের এ আদেশের পরই ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুল্ক কাঠামোয় নতুন পরিবর্তনের ঘোষণা আসে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, শুল্ক নিয়ে এমন ঘন ঘন সিদ্ধান্তে উৎপাদন খরচ ও পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ ক্রেতাদের পকেটে। বিশেষ করে সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো।
রায়ের পরদিন শনিবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক বিশেষ ঘোষণা পত্রে স্বাক্ষর করেছেন, যেখানে ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের ‘সেকশন ১২২’ ধারা ব্যবহার করে বিশ্বের সব দেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ সাময়িক শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে এ ঘোষণার রেশ কাটতে না কাটতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি জানান, শুল্কের হার বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হবে।
ট্রাম্পের এ ধারাবাহিক ঘোষণা দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো, যারা আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১০ শতাংশ শুল্কের বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছিল তারা এখন নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছে।
এছাড়া ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্য থেকে আতঙ্ক আরো তীব্র হয়েছে। যেমন যেসব পণ্য এতদিন শুল্কমুক্ত বা বিশেষ ছাড়ের আওতায় ছিল, সেগুলোর ওপরও হয়তো নতুন করে করের বোঝা চাপানো হতে পারে।
ব্রিটিশ চেম্বারস অব কমার্সের (বিসিসি) বাণিজ্যনীতি বিষয়ক প্রধান উইলিয়াম বেইন মনে বলেন, ‘শুল্ক নিয়ে ক্রমাগত পরিবর্তন এবং এর ফলে সৃষ্ট অস্পষ্টতা ও অনিশ্চয়তা ব্যবসা-বাণিজ্যে এক ধরনের “ক্লান্তি” তৈরি করেছে। ফলে মার্কিন গ্রাহকদের জন্য পণ্যের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো বড় ধরনের বিড়ম্বনায় পড়ছে।’
ব্যবসায়ীদের মনে বাড়ছে শুল্ক আতঙ্ক
বিসিসির প্রাক্কলন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ১৫ শতাংশ শুল্কহারের কারণে দেশটিতে রফতানি করা ব্রিটিশ পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২-৩ বিলিয়ন পাউন্ড (২ দশমিক ৭ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলার) ব্যয়ের বোঝা চাপবে। উইলিয়াম বেইন জানান, বর্তমানে যুক্তরাজ্যের প্রায় ৪০ হাজার কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানি করে। শুল্কের বাড়তি খরচ হয় রফতানিকারকদের বহন করতে হবে, না হয় যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের পকেট থেকে যাবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এ ধরনের পরিস্থিতি ব্যবসায়ীদের মার্কিন বাজারে আগের মতো বড় পরিসরে বাণিজ্য চালিয়ে যেতে নিরুৎসাহিত করবে।’
বেইন আরো উল্লেখ করেন, বিশেষ করে খাদ্য ও পানীয়, টেক্সটাইল, শিল্পজাত পণ্য এবং ইলেকট্রনিক পণ্যের মতো খাতগুলোয় এ অনিশ্চয়তা সবচেয়ে বেশি।
শুল্ক ফেরত পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ শুল্কনীতিকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট। এ রায়ের ফলে গত বছরের এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের দেয়া প্রায় ১৩০ বিলিয়ন বা ১৩ হাজার কোটি ডলার শুল্ক ফেরত পাওয়ার একটি পথ তৈরি হয়েছে। তবে এ অর্থ আসলে ফেরত পাওয়া যাবে কিনা, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়ে গেছে। আদালতের রায়ে শুল্ক ফেরতের বিষয়ে সরাসরি কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এ অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু হলেও তা শেষ হতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে।
আরো শুল্কের আশঙ্কা
হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, মার্কিন অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় কিছু পণ্যকে নতুন শুল্কের আওতামুক্ত রাখা হবে। এর মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ, জ্বালানি পণ্য, যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন সম্ভব নয় এমন কাঁচামাল এবং বিশেষ কিছু কৃষিপণ্য (যেমন: গরুর মাংস ও টমেটো) ও যানবাহন। তবে এ আশ্বাসেও ব্যবসায়ীদের দুশ্চিন্তা কাটছে না। তারা আশঙ্কা করছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ‘ট্রেড অ্যাক্ট’-এর অন্যান্য ধারা ব্যবহার করে এসব পণ্যের ওপরও ভবিষ্যতে নতুন করে শুল্ক চাপিয়ে দিতে পারে।
সাধারণ ক্রেতাদের ওপর প্রভাব
আমদানি করা পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্কের বোঝা শেষ পর্যন্ত কারা বহন করবে, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এর দায় মূলত দুটি পক্ষের ওপর পড়ে। এক. যে কোম্পানি পণ্যটি যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করছে ও দুই. খোদ মার্কিন ভোক্তা। এ হিসাব মেলানো কিছুটা জটিল হলেও ইয়েল ইউনিভার্সিটির গবেষণা কেন্দ্র ‘দ্য বাজেট ল্যাব’-এর মতে, গত বছর থেকে আরোপিত উচ্চ শুল্কের একটি বড় অংশই মার্কিন সাধারণ ক্রেতারা বহন করে আসছেন।
সুপ্রিম কোর্টের রায় ও ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পরিবর্তনের আগে প্রকাশিত ওই গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত শুল্ক ব্যয়ের ৩১-৬৩ শতাংশ পর্যন্ত পণ্যের দাম হিসেবে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।
বিবিসি অবলম্বনে